জালিয়াতির মাধ্যমে ঢাবি শিক্ষক হওয়ার অপচেষ্টা!

জালিয়াতির মাধ্যমে ঢাবি শিক্ষক হওয়ার অপচেষ্টা!


ফটো-সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. মোঃ ইমদাদুল হক এবং এডুকেশনাল এন্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের চেয়ারপারসন প্রফেসর মেহজাবিন হকের সহযোগিতায় জালিয়াতির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চলেছে মোঃ মোস্তাক আহমেদ ইমরান।

ইউনিভার্সিটির সিলেকশন বোর্ড এডুকেশনাল এন্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের লেকচারার হিসেবে দুই জনের মধ্যে তার নাম প্রস্তাব করেছে। আগামী সিন্ডিকেটে এই নিয়োগ চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।

কিন্তু জালিয়াতির মাধ্যমে সে যুক্তরাজ্য থেকে মাস্টার্স করেছে, তার সব রকমের নথিপত্র এ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে৷ জানা যায়, ইমরান এডুকেশনাল এন্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগ থেকে ২০১৫ সালে মাস্টার্স পাস করেন। মেধা তালিকায় তার স্থান ছিল পঞ্চম।

এর আগে জেনারেল সাইকোলজি বিভাগ থেকে স্নাতক পাস করেন। সে ২০১৭ সালে বিভাগে লেকচারার পোস্টে একবার সিলেকশন বোর্ড ফেস করে, কিন্তু রেজাল্ট ভালো না থাকায় তাকে নেওয়া হয় নি।

জালিয়াতির শুরুঃ ইমরান মাস্টার্স এ পড়া অবস্থায় , এডুকেশনাল এন্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগ এর প্রফেসর শাহীন ইসলামের ব্যাক্তিগত প্রতিষ্ঠান ‘হিল বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন’ এ সাব প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে চাকরি করে। যখন রেজাল্ট এর কারণে এডুকেশনাল এন্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগ এ যোগ দিতে পারলো না, তখন প্রফেসর শাহীন ইসলাম তার জন্য যুক্তরাজ্যের রয়েমটন বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই বছরের মাস্টার্স করার ব্যাবস্থা করে দেন।

কিন্তু ওই মাস্টার্স করার অন্যতম শর্ত ছিলো, ” যে মাস্টার্স করবে তাকে ইউনিভার্সিটি তে কর্মরত হতে হবে এবং ফিরে এসে ৩ বছর ওই কোর্সটি পড়াতে হবে। কিন্তু প্রফেসর শাহীন ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে, নিজেই ওই চুক্তি স্বাক্ষর করে ২৩ জুন ২০১৭ এবং ইমরানকে স্কলারশিপ দিয়ে দেয়।

যেভাবে অনিয়মের বিষয়টি জানাজানি হলোঃ ইমরান পড়তে যাবার কয়েকমাস পর, ডিপার্টমেন্ট এ তার স্যালারি স্ট্যটাস নিয়ে যুক্তরাজ্য থেকে একটা ইমেইল আসে। ওই ইমেইল তখন বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর মেহতাব খানম কে ফরওয়ার্ড করা হয়. তিনি ইমেইল দেখে তাজ্জব হয়ে যান, কারণ এই নামে বিভাগে কেউ নাই. তারপর একাডেমিক কমিটি পুরো বিষয়টা তদন্ত করে। তদন্ত করে প্রফেসর শাহীন ইসলামকে দোষী সাব্যস্ত করে। ডিপার্টমেন্ট থেকে উপাচর্য বরাবর একটা চিঠি দাওয়া হয় ১৫ মে ২০১৮।

ডিন ও মেহজাবিন হক এর সম্পৃক্ততাঃ উপাচার্য বরাবর চিঠি দেবার দুই মাসের মধ্যে প্রফেসর মেহতাব খানম অবসরে যান. এরপর ডিপার্টমেন্ট এ চেয়ারম্যান হয় প্রফেসর মেহ্জাবীন হক। মেহ্জাবীন হক পুরো বিষয়টা ধামাচাপা দেবার চেষ্টা করেন ডিন কে সাথে নিয়ে। বিস্ময়কর ভাবে, তিনি ইমরান এর সাথে একটা ৩০০ টাকার স্ট্যাম্প এ চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ইমরান মাস্টার্স শেষ করে দেশে এসে ডিপার্টমেন্ট এ ওই কোর্স (প্লে থেরাপি) করাবেন।

কিভাবে একজন মাস্টার্স শিক্ষার্থীর সাথে , ঢাকা ইউনিভার্সিটি এর একটা ডিপার্টমেন্ট চুক্তি হয়।

মেহ্জাবীন হক স্বাক্ষরিত ২ অক্টোবর ২০১৮ এর ওই চিঠিতে বলা হয়, ডিন মৌখিক নির্দেশ দিয়েছে , তাই তিনি করেছেন। একজন প্রাক্তন ডিন সাংবাদিকদের বলেন, ডিন কিভাবে এই নির্দেশ দিতে পারে, যাতে একটা জালিয়াতির প্রমান আছে। কেন এই চুক্তিঃ মেহ্জাবীন হক , ইমরান এর সাথে চুক্তি করার প্রধান কারণ হলো, তার স্কলারশিপটা ধরে রাখা এবং সে চেয়ারম্যান থাকতে থাকতে ইমরান কে ডিপার্টমেন্ট এ শিক্ষক হিসেবে নিয়ে নেওয়া। যুক্তরাজ্যের ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের অন্যতম শর্ত ছিল, দেশে এসে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ৩ বছর কোর্সটা পড়াতে হবে. অন্যথায় , পুরো স্কলারশিপ এর খরচ ফেরত দিতে হবে।

স্কলারশিপ এর জামিনদার প্রফেসর শাহীন ইসলামকেও দায়ভার নিতে হবে। তাই পুরো বিষয়টি ধামা চাপা দিতেই ইমরান এর সাথে একটা চুক্তি স্বাক্ষর করে। যদিও ইমরান তখন কোর্স টা শেষ করে নি, অর্থাৎ ছাত্র।

এই জালিয়াতির বিষয়টি নিয়ে তখন পর্যন্ত সিন্ডিকেট এ চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। মেহজাবিন হক, সিন্ডিকেট এর ডিসিশন কে প্রভাবিত করার জন্য , আগেভাগেই ইমরান এর সাথে একটা চুক্তি করে,,যাতে তিনি বলতে পারেন যে ডিপার্টমেন্ট তার সাথে এবং প্রফেসর শাহীন ইসলাম এর সাথে আছে। সিন্ডিকেট ৩০ এপ্রিল ২০১৯ এ বিষয়টিকে , বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা পরিপন্থী বলে উল্লেখ করে প্রফেসর শাহীন ইসলাম এর এটা করা সমীচীন হয় নি বলে সতর্ক করে দেয়।

এরকম একটা জালিয়াতির পরও ইমরান কে লেকচারার হিসেবে নেবার জন্য, সিলেকশন বোর্ড অনুমোদন দিয়েছে। ওই বোর্ডে প্রফেসর মেহ্জাবীন হক এবং ডিন ইমদাদুল হক দুই জনেই ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, এ দুজন মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ইমরানকে নিয়োগ দিতে অপচেষ্টা করছেন। ডিসেম্বরের শেষের দিকের ওই বোর্ড, দুই জন এর নাম প্রস্তাব করে।

উল্লেখ্য, ইমরান কে নেওয়ার জন্য দুই জনই নেওয়া হয় এডুকেশনাল সাইকোলজি ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে।

বিভাগের নাম হলো এডুকেশনাল এন্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি – মানে হলো এখানে এডুকেশনাল সাইকোলজি এবং কাউন্সেলিং সাইকোলজি পড়ানো হয়। কাউন্সেলিং সাইকোলজি ব্যাকগ্রাউন্ড এর দুই জন ক্যান্ডিডেট থাকা সত্ত্বেও কাউকে নেওয়া হয় নি। অথচ দুইজন এডুকেশনাল সাইকোলজি ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য , ঢাবির এর এই জালিয়াতির বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে যুক্তরাজ্যের ওই বিশ্ববিদ্যালয় পরে আর কাউকে স্কলারশিপ দেয় নি কর্তৃপক্ষ।

ঢাবির একজন প্রাক্তন ডিন নাম না বলা শর্তে সাংবাদিকদের বলেন, এখানে বেশ কয়েক টি অনিয়ম হয়েছে, প্রথমত অবৈধভাবে স্কলারশিপ দেওয়া হয়েছে, তারপর সেটাকে জাস্টিফাই করার জন্য মাস্টার্স পড়া অবস্থাই আবার চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে, যেটা আরেকটি অবৈধ এবং অনৈতিক কাজ. এই ধরণের ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয়কে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। তিনি আরো প্রশ্ন তোলেন, যেই প্রার্থীকে ২০১৭ সালে অযোগ্যতার কারনে নেয়া হয়নি, তাকে চার বছর পর কেন নেয়া হচ্ছে।

অভিযোগের বিষয়ে ডীন ইমদাদুল হক বলেন,কোনো অনিয়মের সত্যতা পেলে আপনারা নিউজ করেন। প্রফেসর মেহজাবিন হক বলেন, তিনি যা করেছেন তা ডীনের নির্দেশনায় করেছেন। জালিয়াতির বিষয়ে জানতে চাইলে মোস্তাক আহমেদ ইমরানের মুঠোফোনে বার বার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেন নি। এ প্রসঙ্গে ঢাবির উপাচার্য অধ্যাপক ড.মোঃ আখতারুজ্জামান বলেন, আমি বিষয়টি সাংবাদিকদের মাধ্যমে জেনেছি। কোন ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার এবং লাইক করুন..
visitor counter
All rights reserved © 2021 দেশের গর্জন | Desher Garjan
Design & Developed BY Subrata Sutradhar
Translate »